চামড়া শিল্পে নারকীয় পরিস্থিতি: শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা সিন্ডিকেটকে উৎসাহিত করছে | SME TV

মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প

SME tv Desk:

কোরবানির ঈদের পর বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আবারও সংকট ও বিশৃঙ্খলার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। বছরব্যাপী প্রস্তুতির পরও পশু কোরবানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজাত পণ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ভেঙে পড়ছে বাজার, লুটপাটের সুযোগ নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, এবং চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পড়েছেন ব্যাপক লোকসানে। নিং:স্ব হয়ে পড়েছেন মৌসুমি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থার জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত ব্যর্থতা ও সমন্বয়হীনতা। ফলে দেশের রপ্তাণীমুখী অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পে এখন বিরাজ করছে এক নারকীয় পরিস্থিতি যা চামড়া শিল্পকে পাটশিল্পের মতই অতীত করে ফেলছে। আর জাতীয় অর্থনীতি এবং প্রবৃদ্ধিতে পড়ছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব । অন্যদিকে বিদেশী মুদ্রার আয়ও কমছে আশংকাজনক হারে।

সংকটের চিত্র:

চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার কাঁচা চামড়া ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পেরে পঁচে নষ্ট হয়েছে। কিছু জেলায় রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার চামড়া। ঢাকার ট্যানারিগুলো নির্ধারিত দামে চামড়া না কিনে সিন্ডিকেটের সহায়তায় দাম অনেক কমিয়ে ফেলে, ফলে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ছিটকে পড়েন।

সিন্ডিকেটের ভূমিকা:

ট্যানারি মালিকদের একটি গোষ্ঠী প্রতি বছর ঈদের আগেই অঘোষিতভাবে দাম কমিয়ে দেয়। মাঠপর্যায়ে সংগ্রহকারীরা নিরুপায় হয়ে ৩০০ টাকার চামড়া ৫০-১০০ টাকায় বিক্রি করেন। ফলে মাঠ পর্যায়ের উদ্যোক্তা, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও এনজিওগুলো প্রত্যক্ষ ক্ষতির মুখে পড়ে। এবারও সেই একই সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে, আর শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না আসায় তারা আরও উৎসাহ পেয়েছে।

সরকারি ব্যর্থতা ও নীতিগত শূন্যতা:

শিল্প মন্ত্রণালয়ের পূর্বনির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ এবং কাঁচা চামড়া রপ্তানির ঘোষণাও বাস্তবায়িত হয়নি। মাঠপর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লবণ, ট্রান্সপোর্ট ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনও সহায়তা ছিল না। বিভিন্ন জেলা প্রশাসক ও বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয় না থাকায় কোরবানির চামড়া রক্ষা করার সুযোগ পুরোপুরি হাতছাড়া হয়েছে।

লোকসান ও আর্থিক প্রভাব:

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প প্রতিবছর প্রায় ১০০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম। কোরবানির সময় সংগৃহীত চামড়া থেকেই আসে মোট কাঁচা চামড়ার ৫০-৬০ শতাংশ। এবারের বিপর্যয়ে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, রপ্তানিমুখী প্রস্তুতকারক ও হস্তশিল্প উদ্যোক্তাদের উৎপাদন চেইনও ভেঙে পড়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চামড়া শিল্পের এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে করণীয় কি জানতে বাংলাদেশ এসএমই ফোরামের সভাপতি চাষী মামুন-এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এই শিল্পের জন্য কিছু ভবিষ্যৎ করণীয় ও নীতির প্রস্তাবনা করেছেন। চাষী মামুনের প্রস্তাবনা সমূহ হলো-

১. জাতীয় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও বিপণন নীতিমালা প্রণয়ন – যেখানে থাকবে মূলত মজুদ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দাম নির্ধারণের বাস্তবসম্মত কাঠামো।

২. উপজেলা পর্যায়ে প্রি-প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন – লবণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও সাময়িক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে প্রান্তিক পর্যায়ের চামড়া পচে যাওয়া বন্ধ করা।

৩. সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ইউনিট – একটি স্বাধীন বাজার পর্যবেক্ষণ ইউনিট গঠন করে সিন্ডিকেট চিহ্নিত করণ এবং তাৎক্ষনিক শক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

৪. ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস চালু করা – যাতে মাঠ পর্যায়ের সংগ্রহকারীরা সরাসরি ট্যানারির সাথে যুক্ত হতে পারেন।

৫. রপ্তানি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও উৎসাহ – মৌসুম শেষে অব্যবহৃত কাঁচা চামড়া যেন দ্রুত রপ্তানিযোগ্য হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা প্রদান।

৭। চামড়াজাত পণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্রান্ডিং, বাজার সম্প্রসারণ ও বহমুখীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।

৮।  নতুন উদ্যোক্তা তৈরী ও বিকাশে উদ্বুদ্ধকরণ ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ।

৯। চামড়া ব্যবসা ও চামড়াজাত পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ ও আর্থিক প্রণোদোনার ব্যবস্থা করা।

১০। আধুনিক প্রযুক্তি তথা AI -এ সমৃদ্ধ প্রসেসিং, উৎপাদন ও বিডনন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এক কথায় প্রযুক্তি নির্ভর ইকো সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা।

প্রতিবছর কোরবানির সময় চামড়া সংকট যেন একটি পূর্বানুমেয় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল একটি শিল্পের সংকট নয়, এটি সরকারের শাসন ও দায়িত্বহীনতারও প্রতিচ্ছবি। এখনই যদি টেকসই ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তার লেদার ইন্ডাস্ট্রির অবস্থান হারাতে বসবে।

SME tv/১৪ জুন ২০২৫/ঢাকা