জুলাই হেরে যাচ্ছে কেন? -চাষী মামুন এর বিশ্লেষণ | July | Revolution | SME tv

জুলাই হেরে যাচ্ছে কেন?

এইতো সেদিন মাত্র ১০ মাস আগে দুনিয়া কাঁপানো এক ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের চরম ঘৃণিত মাফিয়া হাসিনা সরকার উৎখাত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এটাই প্রথম পলায়নের উদাহরণ! এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসেও খুব বেশী উদারহণ নেই। সে সময় জুলাই হত্যার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে সমগ্র জাতি ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মধ্য দিয়ে এক হয়েছিলো। ভারতের দাস খ্যাত আওয়ামী সরকারের মসনদ চুরমার করে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো জনগণ। অথচ দু:খের বিষয় হলো যে সেই ঐক্য আজ ভিষন অনৈক্যে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। বিপ্লবীরা ভাগ হয়ে গিয়েছে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দল ও পক্ষগুলো এতটাই বিভক্ত হয়ে গেছে যে- স্বয়ং সেনা প্রধানও হুশিয়ার করে পতিত ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সতর্কতা দিয়েছেন এমনকি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব থাকবে না বলে আশংকা করে দ্রুত জুলাই ঐক্যে ফিরে যেতে আহবান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের হৃদস্পন্দনে আজ এক চাপা কান্না, এক অবর্ণনীয় অভিব্যক্তি- যা ভাষাহীন। আমরা যারা ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের গৌরব, সাহস ও স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এগিয়েছিলাম, আজ তাদেরই চোখেই ক্লান্তি, কণ্ঠে প্রশ্ন- ‘জুলাই কি হার মানছে’?

দেয়ালে এখনো লেগে আছে রক্তের ছাপ, এখনো মুগ্ধের আওয়াজ শোনা যায় ‘পানি লাগবে পনি?’ এখনো আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিমরা রাষ্ট্রের জন্য গুলির মুখে বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছে! তবে কেন এখনই এই বিপ্লবের প্রাত:বেলায় সেই জুলাই হেরে যেতে বসেছে? এই প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তার, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এবং মাতৃভূমি’র স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দীপ্ত অঙ্গীকারের প্রতিধ্বনি।

আমি আজ কোন দলীয় ব্যানারে নয়, বরং একটি বিবেক, একটি রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাষ্ট্রভক্ত একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের সামনে আমার বিশ্লেষন এবং ভাবনা তুলে ধরছি।

কারণ আমি অনুভব করি- যে আন্দোলনের গায়ে আমরা "জাতীয় জাগরণের সূচনা এবং নতুন বাংলাদেশের জন্য নয়া বন্দোব্যবস্ত” বলে লেবেল দিয়েছিলাম, সেই আন্দোলনের চেতনা আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার দ্বন্দে, ভয়ের দেয়ালে, ষড়যন্ত্রের ধোঁয়াশায়, এবং অবিশ্বাসের গাঢ় ছায়ায়।

আজ আমি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করছিনা, বরং চিহ্নিত করছি সেই গভীর কারণগুলো যা আমাদের গৌরবময় মুহূর্তকে নিস্তব্ধ করে দিচ্ছে এবং যা ‘জুলাই’ নামের দু:সাহসী অধ্যায়কে ইতিহাসের পাতায় বন্দী করে দিতে চায়।

আমাদের সামনে এখনো সুযোগ আছে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার, বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হওয়ার। আর নতজানু নয়, গর্বিত উচ্চারণে এখন সময় বলার: “জুলাই হারেনি, হারবে না যদি আমরা জেগে উঠি আবার।”

এখন প্রশ্ন হলো সেই জুলাই হেরে যাচ্ছে কেন?

আমি আমার ক্ষুদ্র রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অবজারভেশন থেকে জুলাই হেরে যাওয়ার দৃশ্যত ও বাস্তবিক কয়েকটি কারন উল্লেখ করছি:

১। সকল স্টেইক হোল্ডারদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন না করা। (গোড়ায় গলদ)

২। বিপ্লব পরবর্তী গঠিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালায় কোন রোডম্যাপ তৈরী করতে না পারা এবং সরকার কর্তৃক রাষ্ট্র পূণর্গঠণ ও সংস্কারে সার্বজনীন কাঠামো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে তা নাগরিকদের নিকট স্পষ্ট উপস্থাপন করতে না পারা।

৩। সরকার ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানে অক্ষম, অনভিজ্ঞ এবং অতিশয় এলিটদের (যারা সারাজীবন লাভের পক্ষে) নিয়ে অন্তরবর্তীকালীন সরকার গঠন করা। বিপ্লবোত্তর সরকারের যে টোন বা মেজাজ থাকে বা থাকার কথা তা না থাকা।

৪। সংস্কার এবং নির্বাচনকে মুখোমুখি দাঁড় করানো। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একরকম অপরাধমূলক বা না-জায়েজ কর্মকান্ড হিসেবে চিহ্নিত করে জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি দাঁড় করানো এবং ‘রাষ্ট্র ও সংবিধান গঠন’ তথা গণপরিষদ নির্বাচন বিষয়ক কবি ফরহাদ মজহারের একটি তাত্ত্বিক ন্যারেটিভকে সামনে এনে জুলাই ঐক্যে বিভাজন সৃষ্টি করে রাজনৈতিক মাইনাস খেলা। এই ব্যাখ্যা বা তত্ত্ব প্রয়োগের উদাহরণ থাকলেও এই মুহুর্তে এটা বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে সমযোপযোগী নয়। এতে রাষ্ট্রে সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট, বিভাজন ও দ্বন্দ বাড়ছে এবং রাষ্ট্র ও জাতিকে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বিদেশী শক্তির প্রভাব ও হস্তক্ষেপ বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে।

৫। সরকারের পক্ষপাতমূলক কর্মকান্ড- ফলে শুরুতেই সরকারের প্রতি স্টেইক হোল্ডারদের আস্থা এবং বিশ্বাস ও সরকারের সার্বজনিনতা ক্ষুন্ন করেছে।

৬। অন্তরবর্তীকালীন সরকার তাদের দায়িত্বের প্রায়োরিটির কথা মুখে বললেও বাস্তবায়নে বিপরীতে ছোটা।

৭। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের ক্রেডিট কুক্ষিগত করা যেমন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র ইজারাদারী নিয়েিেছলো পতিত ফ্যাসিস্ট দল আ’মলীগ! ২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থান ক্রেডিট একচ্ছত্র দখলে নিতে চেষ্টা করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এবং পরবর্তীতে সদ্য গঠিত পাওয়ার পার্টি এনসিপি।

৮। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং পতিত আ’মলীগের এজেন্ট দ্বারা জামায়াত সহ বেশিরভাগ ইসলামী দলগুলোকে বিএনপি’র মুখোমুখি দাঁড় করাবার চেষ্টা করা এবং কোমলমতি বিপ্লবী ছাত্র সমন্বয়কদের (বিপ্লবীদের) জামাত কর্তৃক হাইজ্যাক করে মিসগাইড করা।

৯। মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে ছাপিয়ে ২০২৪ এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের একটি "রাষ্ট্রঘাতি" ন্যারেটিভ তৈরী করা।

১০। জুলাই চার্টারের নামে জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীতাকে ঢেকে ফেলে জুলাই আন্দোলনে জামাতের ভূমিকাকে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে মনে হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ভুল ছিলো এবং জামায়াত কোন অপরাধ করেনি, তারা আসলে দেশপ্রেমিক।

১১। একই সাথে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি মাইনাস ফরমুলা বাস্তবায়নে জামায়াতের দেশী-বিদেশী আঁতাত এবং ষড়যন্ত্র। এবং বিএনপি’র বিরুদ্ধে জণমনে ঘৃণা ও ক্ষোভ সঞ্চার করে এমন বিশেষ ন্যারেটিভ তৈরী করে সোস্যাল মিডিয়ায় ক্যু করা।

১২। জামায়াতের আমীরের আ’মলীগকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং রক্তের দাগ শুকাবার আগেই দখলদার ভারতের সাথে নতুন প্রেমের সম্পর্ক গড়ার ঘোষণা। যা সরাসরি জুলাইয়ে আত্মত্যাগ, রক্ত এবং স্পীরিটের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা এবং মোনাফেকি।

১৩। জুুলাই বিপ্লবে সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান এবং দেশপ্রেমিক সসস্ত্র বাহিনীর অবদানকে অস্বীকার করে তাঁদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠা। সেইসাথে সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর/অথবা সেনাপ্রধানের দুরত্ব এবং আস্থা-অনাস্থার টানপোড়েন।

১৪। প্রশাসন, শিক্ষা সহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সমূহ জামাতীকরণের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আ’মলীগকে টিকিয়ে রাখা।

১৫। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের অতিমাত্রায় ক্ষমতার দাপট এবং অন্যকে তোয়াক্কা বা কেয়ার না করা।

১৬। সর্বোপরি বিতর্কিত লোকদের রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসেটিভ পদে অধিষ্ঠিত করা। ... এমন আরো অনেক কারণ আছে...!

- চাষী মামুন
কেবিনেট প্রেসিডেন্ট,
যুক্ত ফোরাম।