SME Bangladesh : A History of Growth & Innovation
বাংলাদেশ এসএমই ফোরাম
বাংলাদেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে করণীয়: ৩য় পর্ব
এখন সময় এসেছে এসএমই খাতকে প্রযুক্তি, রপ্তানি এবং সবুজ অর্থনীতির মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর। এই পর্বে আমরা তিনটি গঠনমূলক দিক বিশদভাবে বিশ্লেষণ করবো। যথা- ১. প্রযুক্তিনির্ভর এসএমই রূপান্তর ২. রপ্তানিমুখী এসএমই সম্প্রসারণ ৩. সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই এসএমই উদ্যোগ:
১. প্রযুক্তিনির্ভর এসএমই রূপান্তর (Tech-Enabled Transformation): প্রযুক্তির সুবিধা শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্য সরকারকে প্রতিটি উপজেলায় 'এসএমই টেকনোলজি হাব' গড়ে তুলতে হবে, যেখানে থাকবে ইন্টারনেট এক্সেস, কম্পিউটার ট্রেনিং, এবং ইনোভেশন সাপোর্ট। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল স্কিল শেখাতে মোবাইল ট্রেনিং ভ্যান চালু করা যেতে পারে। “ডিজিটাল এসএমই ট্রান্সফরমেশন স্কিম”-এর আওতায় হাইটেক ইকুইপমেন্ট ও সফটওয়্যারের জন্য ভর্তুকি ও করছাড় দরকার। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশদ আলোচনা:
শহর থেকে গ্রামে: উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তির আওতায় আনার কৌশল ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা দিন দিন প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছেন, তবে এই রূপান্তর মূলত শহরকেন্দ্রিক। গ্রামীণ উদ্যোক্তারা এখনো পিছিয়ে রয়েছেন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সেবার অভাবে। দেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রযুক্তির সুষম সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন প্রয়োজন।
১.১ গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তির আওতায় আনা:
ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেন্টার বা ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠা করে উদ্যোক্তাদের অনলাইন ব্যবসা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স প্রশিক্ষণ।
মোবাইল অ্যাপভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সহজ ভাষায় তৈরি অ্যাপের মাধ্যমে পরামর্শ সেবা।
শহরের সফল উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মেন্টরশিপ প্রোগ্রামে যুক্তকরণ।
১.২. প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উপায়:
ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়ন: প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রডব্যান্ড/ফাইবার অপটিক্স সম্প্রসারণ।
ভর্তুকিভিত্তিক ডিভাইস সরবরাহ: স্মার্টফোন, কম্পিউটার, POS মেশিনে সহজ শর্তে লোন।
জি-মেইল, গুগল ড্রাইভ, ক্যানভা, টালি সফটওয়্যার ব্যবহারে উন্মুক্ত প্রশিক্ষণ।
১.৩. সরকার কর্তৃক লজিস্টিক সহায়তা:
হাব-টু-সিটি কালেকশন পয়েন্ট: সরকারি বা PPP মডেলে হাব গড়ে পণ্য সরবরাহ।
ওয়ান-স্টপ লজিস্টিক সার্ভিস: উদ্যোক্তাদের কুরিয়ার সংযোগ সহজীকরণ।
ফাস্ট ট্র্যাক ডেলিভারি সাবসিডি: স্থানীয় পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক ডেলিভারি।
১.৪. বিশ্বমানের প্রযুক্তি এক্সপার্ট উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের সহায়তা:
কোডিং, ডিজাইন, ডেটা অ্যানালিটিক্স বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
ইংরেজি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি।
গ্লোবাল এক্সপোজার ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ।
১.৫. অত্যাবশ্যকীয় টেক লার্নিং:
AI ও মেশিন লার্নিং: কাস্টমার বিশ্লেষণ, কনটেন্ট অটোমেশন।
Google Ads, Facebook Pixel, SEO টুলস।
Shopify, WooCommerce, Daraz সেলার পোর্টাল।
bKash, Nagad, iPay, QR-based পেমেন্ট।
Tally, QuickBooks ইত্যাদি।
২. রপ্তানিমুখী এসএমই সম্প্রসারণ (Export-Oriented Diversification): বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভরতা এখনও গার্মেন্টস কেন্দ্রীক। এসএমই খাতকে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একটি "এসএমই এক্সপোর্ট এক্সিলারেশন ফান্ড" গঠন করে স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেশন, প্যাকেজিং, এবং আন্তর্জাতিক ট্রেড মিশনে অংশগ্রহণের খরচে সহায়তা দিতে হবে। রপ্তানিতে নবীন উদ্যোক্তাদের প্রবেশে সাপোর্ট সেল এবং সহজতর নিয়মকানুন নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই এসএমই উদ্যোগ (Green SMEs & Circular Economy): জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এসএমই খাতকে “সবুজায়ন” করতে হবে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রযুক্তি, রিনিউএবল এনার্জি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইনোভেশন ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসে উৎসাহ দিতে হবে। সবুজ ফাইন্যান্স স্কিম চালু করে পরিবেশবান্ধব এসএমই-দের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি, নারীদের নেতৃত্বাধীন সবুজ উদ্যোগগুলিকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করতে হবে।
উপসংহার: এসএমই খাতের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, বৈশ্বিক বাজার ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের উপর নির্ভর করছে। যদি সরকার, বেসরকারি খাত এবং উদ্যোক্তা সমাজ সম্মিলিতভাবে এই তিনটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে রূপান্তর ঘটাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে এসএমই খাতের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।
পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করবো— এসএমই নীতিমালার রূপায়ন কৌশল, জবাবদিহিতা ও মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে।
লেখক: চাষী মামুন